সাতক্ষীরা প্রতিনিধি: আর একদিন পরেই বাজারে উঠতে যাচ্ছে সাতক্ষীরার সুস্বাদু আম। মৌসুমের শুরুতেই জেলার আমচাষি ও ব্যবসায়ীদের মাঝে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের আগে সাতক্ষীরার আম বাজারে আসায় এর চাহিদা ও জনপ্রিয়তা বরাবরই শীর্ষে থাকে।
জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরায় প্রায় ৩২০টি আমবাগান রয়েছে এবং এ খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত আছেন ৫০ হাজারের বেশি চাষি ও ব্যবসায়ী। চলতি মৌসুমে জেলায় আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৭০ হাজার টন, যার মধ্যে ১০০ টন আম বিদেশে রপ্তানির পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী এক মাসে প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ কোটি টাকার আম বেচাকেনা হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে আম ব্যবসাকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যে সাতক্ষীরা শহরের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নিয়েছেন। তারা বাগান পরিদর্শন ও বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মনির হোসেন জানিয়েছেন, নিরাপদ ও বিষমুক্ত আম বাজারজাত নিশ্চিত করতে প্রশাসনের নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। তিনি বলেন, “কোনো ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার করে আম পাকানো বা বাজারজাত করা যাবে না। এ ধরনের অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে মৌসুম শুরুর আগেই নানা সংকটে পড়েছেন স্থানীয় আমচাষিরা। কৃষকদের অভিযোগ, জেলা প্রশাসনের নির্ধারিত আম সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণের সময়সূচি দেরিতে হওয়ায় তারা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। বিশেষ করে সাতক্ষীরার লবণাক্ত মাটি ও পানির কারণে এখানকার আম দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় ১০ থেকে ১৫ দিন আগে পেকে যায়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের আগে আম সংগ্রহের অনুমতি না থাকায় অনেক পাকা আম গাছ থেকে ঝরে পড়ে নষ্ট হচ্ছে।
এর মধ্যে গত ৩০ এপ্রিলের কালবৈশাখী ঝড়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন চাষিরা। ঝড়ে গাছভর্তি পাকা আম ঝরে পড়ে যাওয়ায় লোকসানের পরিমাণ বেড়েছে কয়েকগুণ।
তালা উপজেলার খলিশখালি গ্রামের আম ব্যবসায়ী শাহিন কাগজী বলেন, “এ বছর আমের ফলন ভালো হলেও সময়মতো বিক্রি করতে না পারায় আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। আমি প্রায় ৬০ লাখ টাকা দিয়ে বাগান কিনেছি, কিন্তু ঝড় ও আগাম পাকার কারণে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছি।”
একই কথা জানিয়ে আমচাষি জালাল উদ্দিন বলেন, “ঋণ নিয়ে বাগান পরিচর্যা করেছি। আম ভালো হয়েছে, কিন্তু সংগ্রহের তারিখ দেরি হওয়ায় ঝড়ে পড়ে যাচ্ছে। আমরা চাই, আগামী বছর থেকে আম পাড়ার সময় এগিয়ে আনা হোক।”
শ্যামনগর, কালিগঞ্জ, আশাশুনি, তালা ও দেবহাটা উপজেলার চাষিরা জানান, তাদের অঞ্চলের গোপালভোগ, গোবিন্দভোগ ও বোম্বাই জাতের আম আগেভাগেই পেকে যায়। অথচ যশোরের সঙ্গে মিলিয়ে সময়সূচি নির্ধারণ করায় তারা বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সিদ্ধান্তের শিকার হচ্ছেন।
উল্লেখ্য, জেলা প্রশাসনের নির্ধারিত ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, ৫ মে থেকে গোপালভোগ, গোবিন্দভোগ ও বোম্বাই, ১৫ মে থেকে হিমসাগর, ২৭ মে থেকে ল্যাংড়া এবং ৫ জুন থেকে আম্রপালি জাতের আম সংগ্রহের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
চাষি ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাতক্ষীরার ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় এনে আম সংগ্রহের সময়সূচি অন্তত ১০ থেকে ১৫ দিন এগিয়ে আনা হলে ক্ষতি কমবে এবং জেলার অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
মোমিন/ হাফিজ/ আয়না নিউজ