শৈশবের স্বাভাবিক জীবন এবং সম্মানের নিরাপদ আশ্রয় কেড়ে নিয়েছিল একাত্তরের যুদ্ধ। স্বাধীনতার জন্য নিজের সম্ভ্রম বিসর্জন দেয়া বীরাঙ্গনা টেপরী রাণী (৭২) এবার বিদায় নিলেন পৃথিবী থেকে। তার মৃত্যুতে কান্নায় ভেঙে পড়েছে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার বলিদ্বারা গ্রামের মানুষ।
উপজেলার বলিদ্বারা গ্রামের বাসিন্দা মৃত মধুদাস রায়ের মেয়ে টেপরী রাণী দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা রোগে মঙ্গলবার (১২ মে) রাতে ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
বুধবার (১৩ মে) সকালে রাণীশংকৈল উপজেলার নন্দুয়ার ইউনিয়নের বলিদ্বারা গ্রামে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। রাণীশংকৈল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খাদিজা বেগম, রাণীশংকৈল থানার ওসি (তদন্ত) রফিকুল ইসলাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা এসময় উপস্থিত ছিলেন।
১৯৭১ সালের এপ্রিলের শেষ দিকে মাত্র ১৭ বছর বয়সী টেপরী রাণীকে পরিবারের সদস্যদের প্রাণ রক্ষার আশায় অসহায় বাবা মেয়েকে পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে তুলে দিতে বাধ্য হলে এরপর টানা সাত মাস পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনের শিকার টেপরী রাণী নিজের সম্ভ্রম বিসর্জন দিয়ে তিনি রক্ষা করেছিলেন পরিবারের অন্য সদস্যদের জীবন।
আরও পড়ুন-
৯৪ কোটি টাকার স্বর্ণ আত্মসাৎ: সাবেক সেলসম্যান গ্রেফতার
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অন্তঃসত্ত্বা টেপরী রাণী বাড়ি ফিরে আসলে সমাজ তাকে আপন করে নেয়নি। অনাগত সন্তানকে নষ্ট করে ফেলতে চারদিক থেকে নানা চাপে মেয়ের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ান বাবা। ছেলে সুধীর বর্মনের জন্মের পরে থেকেই সুধীরকে ‘পাঞ্জাবির বাচ্চা’ বলে কটূক্তি করতে পিছু ছাড়েনি সমাজ। ২০১৭ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি পান টেপরী রাণী।
টেপরী রাণী শুধু একজন বীরাঙ্গনা নন, তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস। তার জীবন দেশের স্বাধীনতার জন্য নারীদের আত্মত্যাগের গভীরতা স্মরণ করিয়ে দেয় বলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা রিয়াজুল ইসলাম ।
ছেলে সুধীর বর্মন বলেন, আমাকে নিয়ে মাকে অনেক অপমান সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু দেশের জন্য মায়ের যে ত্যাগ, সেটা কখনও ভোলার নয়। ২০১৭ সালে মা বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি পাওয়ার পর আমাদের জীবনে কিছুটা স্বস্তি আসে।
রাণীশংকৈল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খাদিজা বেগম বলেন, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে। দেশের জন্য তার অবদান জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।
এফ এ/আয়না