দেশে আয়বৈষম্য কমাতে উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের ওপর করের বোঝা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পরিকল্পনা অনুযায়ী, বার্ষিক ৩ কোটি টাকার বেশি আয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত আয়করের হার বর্তমান ৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ করা হবে। প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থা কার্যকর হবে ২০২৮-২৯ করবর্ষ থেকে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের বাজেটে ব্যক্তি করদাতাদের জন্য পাঁচ বছরের একটি দীর্ঘমেয়াদি কর কাঠামো ঘোষণা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে করদাতারা আগামী কয়েক বছরে কী হারে কর দিতে হবে, সে বিষয়ে আগাম ধারণা পাবেন। একই সঙ্গে সরকার কর ব্যবস্থায় পূর্বানুমানযোগ্যতা ও নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে চায়।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ করবর্ষে করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হবে। এরপর প্রথম ৪ লাখ টাকা আয় করমুক্ত থাকবে। পরবর্তী ৩ লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ, পরবর্তী ৪ লাখ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ, পরবর্তী ৫ লাখ টাকার ওপর ২০ শতাংশ, পরবর্তী ২০ লাখ টাকার ওপর ২৫ শতাংশ এবং পরবর্তী ২ কোটি ৬৪ লাখ টাকার ওপর ৩০ শতাংশ হারে কর আরোপ করা হবে।
তবে মোট আয় ৩ কোটি টাকা অতিক্রম করলে অতিরিক্ত অংশের ওপর ৩৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। অর্থাৎ ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত আয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ করহার ৩০ শতাংশই থাকবে, কিন্তু এর বেশি আয়ের ক্ষেত্রে নতুন উচ্চ করহার প্রযোজ্য হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই বর্ধিত করহার সাধারণ বা মধ্যবিত্ত করদাতাদের জন্য নয়। এটি কেবল উচ্চবিত্ত ও অতি-ধনী করদাতাদের একটি সীমিত অংশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। সরকারের মতে, সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং ধনী-দরিদ্র বৈষম্য কমানোর লক্ষ্যে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এদিকে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের করদাতাদের জন্য কিছুটা স্বস্তিও থাকছে। আগামী ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষে করমুক্ত আয়সীমা বর্তমান ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পরবর্তীতে ২০৩০-৩১ করবর্ষে এই সীমা আরও বাড়িয়ে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা করা হবে।
বিশেষ শ্রেণির করদাতাদের জন্যও বাড়ানো হচ্ছে করমুক্ত আয়ের সীমা। নারী করদাতা ও ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা ধাপে ধাপে বৃদ্ধি করা হবে। একই সুবিধা পাবেন তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী করদাতা এবং গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই যোদ্ধারা। প্রতিবন্ধী সন্তানের অভিভাবকদের জন্যও অতিরিক্ত করমুক্ত আয়ের সুবিধা বহাল থাকবে।
প্রস্তাবিত কর কাঠামোর আওতায় ২০৩০-৩১ করবর্ষে প্রথম ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা আয় করমুক্ত থাকবে। এরপরের স্তরগুলোতে ১০, ১৫, ২০, ২৫ ও ৩০ শতাংশ করহার বহাল থাকবে। তবে ৩ কোটি টাকার বেশি আয়ের ক্ষেত্রে ৩৫ শতাংশ করহার কার্যকর থাকবে।
অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের ওপর তুলনামূলক বেশি কর আরোপের পক্ষে মত দিয়ে আসছেন। তাদের মতে, প্রগতিশীল করব্যবস্থা আয়বৈষম্য কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কর বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের মতে, যারা নিয়মিত কর পরিশোধ করেন এবং কর-অনুগত, তাদের ওপর অতিরিক্ত করের চাপ সৃষ্টি করলে বিনিয়োগ ও কর প্রদানে অনীহা তৈরি হতে পারে।
এদিকে সরকারের লক্ষ্য মধ্যমেয়াদে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করা এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ১৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া। এজন্য করভিত্তি সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, কর অব্যাহতি ধীরে ধীরে কমানো এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সরকার মনে করছে, প্রস্তাবিত এই কর সংস্কার রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি একটি আরও ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
রিয়াদ খান/আয়না নিউজ