দক্ষিণ আমেরিকার বৃহত্তম দেশ ব্রাজিল শুধু আমাজনের অরণ্য কিংবা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই বিখ্যাত নয়; বিশ্বজুড়ে দেশটির সবচেয়ে বড় পরিচয় ফুটবল। ব্রাজিলের মানুষের আবেগ, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে ফুটবল এমনভাবে মিশে গেছে যে, একে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। কার্নিভালের উচ্ছ্বাস, সাম্বার ছন্দ আর ফুটবলের নান্দনিকতা মিলেই গড়ে উঠেছে ব্রাজিলের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়।
ব্রাজিলিয়ান ফুটবল বরাবরই পরিচিত তার শিল্পসুলভ সৌন্দর্যের জন্য। মাঠে খেলোয়াড়দের ড্রিবলিং, ক্ষিপ্র পাসিং কিংবা আক্রমণ গঠনের ধরন অনেকটা নৃত্যের মতোই ছন্দময়। গোল করার পর খেলোয়াড়দের উদযাপনেও দেখা যায় সাম্বা নাচের প্রভাব। তাই ফুটবলপ্রেমীরা ব্রাজিলের খেলাকে প্রায়ই ‘সাম্বা ফুটবল’ নামে অভিহিত করেন।
ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী নৃত্য ‘সাম্বা’ শুধু একটি নাচ নয়, এটি দেশটির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের অংশ। রিও ডি জেনিরোর কোপাকাবানা সৈকত, ফাভেলার সরু গলি কিংবা শহরের উন্মুক্ত প্রান্তরে সাম্বার ছন্দে বেড়ে ওঠেন ভবিষ্যতের ফুটবল তারকারা। সেই পরিবেশ থেকেই জন্ম নিয়েছেন পেলে, গারিঞ্চা, জিকো, রোমারিও, রোনালদো ও রোনালদিনহোর মতো কিংবদন্তিরা।
অন্যদিকে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক উৎসবগুলোর একটি ‘রিও কার্নিভাল’ ব্রাজিলের প্রাণের উৎসব হিসেবে পরিচিত। প্রতি বছর লাখো মানুষ বর্ণিল সাজে অংশ নেন এই উৎসবে। সেখানে সাম্বা, সংগীত ও ফুটবলের আবহ একাকার হয়ে ওঠে। ব্রাজিলীয়দের কাছে কার্নিভাল, সাম্বা ও ফুটবল—এই তিনটি বিষয়ই জাতীয় আবেগের প্রতীক।
এই তিন সংস্কৃতির বৈশ্বিক স্বীকৃতি দিতে ২০১৩ সালের ফিফা কনফেডারেশন কাপের অফিসিয়াল বলের নাম রাখা হয়েছিল ‘কাফুসা’। এটি এসেছে কার্নিভাল ফুটবল এবং সাম্বা এই তিনটি শব্দের সমন্বয়ে।
ফুটবলের ইতিহাসেও ব্রাজিল সবচেয়ে সফল দল। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পাঁচবার শিরোপা জিতেছে সেলেসাওরা—১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪ ও ২০০২ সালে। এছাড়া ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের চলমান আসর পর্যন্ত প্রতিটি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া একমাত্র দলও ব্রাজিল।
ব্রাজিলের ফুটবল ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে উজ্জ্বল করেছেন অসংখ্য কিংবদন্তি ফুটবলার। ফুটবলের রাজা পেলে একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি গড়েছেন। গারিঞ্চার অসাধারণ ড্রিবলিং, জিকোর শিল্পময় ফুটবল, রোমারিওর ক্ষিপ্রতা, রোনালদোর বিধ্বংসী আক্রমণ আর রোনালদিনহোর জাদুকরী নৈপুণ্য ফুটবলকে দিয়েছে ভিন্ন এক সৌন্দর্য।
ব্রাজিলীয়দের কাছে ফুটবল কেবল খেলা নয়; এটি আনন্দ, উৎসব ও সংস্কৃতি প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম। কাতার বিশ্বকাপের হতাশা পেছনে ফেলে ২০২৬ বিশ্বকাপে ষষ্ঠ শিরোপা জয়ের স্বপ্নে বিভোর সেলেসাও সমর্থকেরা। আর বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর চোখ থাকবে আবারও সেই সাম্বা জাদুকরদের নান্দনিক ফুটবলের দিকে।
হাফিজ/ আয়না নিউজ