ব্রেন টিউমারের অস্ত্রোপচারের পরও কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার কৃষক মাহবুবুর রহমানের (৫০) টিউমার অপসারণ না হওয়ার অভিযোগে চট্টগ্রামের এক নিউরোসার্জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয়েছে। আদালতের নির্দেশে ঘটনাটি তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
মাহবুবুর রহমান চকরিয়া উপজেলার লক্ষ্যারচর ইউনিয়নের সিকলঘাট এলাকার বাসিন্দা। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, চিকিৎসার নামে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিভিন্ন খাতে তাদের কাছ থেকে প্রায় ১৪ লাখ টাকা নেয়া হলেও অস্ত্রোপচারের পরও টিউমার থেকে যায়। পরে সেটির আকার আরও বড় হয়েছে বলে চিকিৎসকেরা জানান।
মামলায় আসামি করা হয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ও নিউরোসার্জন ডা. মো. ইসমাইল হোসেনকে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন মাথাব্যথা ও শারীরিক জটিলতায় ভোগার পর গত বছরের জুলাইয়ে মাহবুবুর রহমানকে চট্টগ্রামে নেওয়া হয়। এমআরআই ও সিটি স্ক্যানের পর চিকিৎসক দ্রুত অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন এবং বিলম্ব হলে রোগীর মৃত্যু হতে পারে বলে সতর্ক করেন। চিকিৎসার জন্য সাত থেকে আট লাখ টাকা লাগবে বলেও জানানো হয়।
এ অবস্থায় পরিবার জমিজমা বিক্রি ও ধারদেনা করে চিকিৎসার টাকা জোগাড় করে। গত বছরের ২৬ জুলাই চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ডা. ইসমাইল হোসেনের তত্ত্বাবধানে তার অস্ত্রোপচার হয়।
মামলার এজাহারে বলা হয়, অপারেশনের পর আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সে রোগীকে হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেওয়া হয়। ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টারে বিল বাবদ ৮৩ হাজার ৭০০ টাকা এবং অস্ত্রোপচার ফি হিসেবে আরও দুই লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে ২৭ জুলাই থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ৪ লাখ ৫৯ হাজার ৯১৫ টাকা ব্যয় হয়।
ছাড়পত্র দেয়ার সময় চিকিৎসক অপারেশন সফল হয়েছে বলে আশ্বস্ত করলেও বাড়ি ফেরার পর মাহবুবুর রহমানের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে বলে পরিবারের দাবি।
পরে পুনরায় চিকিৎসকের কাছে গেলে তিন মাস পর আসতে বলা হয়। কিন্তু অবস্থার আরও অবনতি হলে গত বছরের ২১ অক্টোবর তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি বোর্ড পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানায়, টিউমার আগের জায়গায়ই রয়েছে এবং সেটির আকারও বেড়েছে। দ্রুত পুনরায় অস্ত্রোপচারের সুপারিশ করা হয়।
এ নিয়ে ডা. ইসমাইল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তাদের অপমান করে বের করে দেন বলেও মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
পরবর্তীতে গত বছরের ৯ নভেম্বর চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিউরোসার্জন ডা. আনিসুর রহমানের কাছে রোগীর কাগজপত্র দেখানো হয়। তিনি পুনরায় অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিয়ে জানান, আইসিইউ ও কেবিন ব্যয়সহ নতুন করে অপারেশন করতে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা লাগতে পারে।
ঘটনার পর মাহবুবুর রহমানের স্বজন আরিফুল ইসলাম গত ২৪ নভেম্বর চট্টগ্রামের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন। তিনি চকরিয়া উপজেলার কাকারা ইউনিয়নের এসএম চর কাকারা গ্রামের বাসিন্দা।
বাদীপক্ষের আইনজীবী বিশ্ব মিত্র বড়ুয়া বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোকে তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, মামলাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে চিঠি দিয়ে মেডিকেল বোর্ড গঠনের অনুরোধ জানানো হয়েছে। বোর্ডের মতামত পাওয়ার পর পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. মো. ইসমাইল হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তদন্ত কমিটির কাছে তিনি ও তার সার্জিক্যাল টিম বিস্তারিত বক্তব্য দিয়েছেন। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে বলেও তিনি দাবি করেন।
তিনি আরও বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো “মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত”। চট্টগ্রামে ব্রেইন টিউমারের অপারেশন সেবা ব্যাহত করতেই একটি সংঘবদ্ধ চক্র পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
এদিকে, চট্টগ্রামের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মো. তৌহিদুল আনোয়ার জানান, বিষয়টি নিয়ে সিভিল সার্জন কার্যালয় অবগত নয় এবং এ সংক্রান্ত কোনো চিঠিও তারা পাননি। তবে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম।
হাফিজ/ আয়না নিউজ