বিশেষ প্রতিনিধি, nipon।।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ৫১ দফা ও ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে ইশতেহারের নাম দেওয়া হয়েছে ‘করবো কাজ, গড়বো দেশ’।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই ইশতেহার ঘোষণা করেন।
বিএনপি জানিয়েছে, ইশতেহারটি পাঁচটি অধ্যায়ে বিভক্ত। ক্ষমতায় এলে আগামী পাঁচ বছরে রাষ্ট্র পরিচালনায় ৫১টি দফাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। পাশাপাশি জনকল্যাণ ও অর্থনৈতিক সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিয়ে ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
দলটির এবারের ইশতেহার প্রণয়নে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা রাষ্ট্রদর্শন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ‘ভিশন-২০৩০’ এবং তারেক রহমান ঘোষিত রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফাকে ভিত্তি হিসেবে নেওয়া হয়েছে।
ইশতেহার ঘোষণায় বিএনপি দাবি করে, তারা স্লোগাননির্ভর রাজনীতির পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনায় বিশ্বাসী। দলটির ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হবে লুটপাট নয় উৎপাদন, ভয় নয় অধিকার এবং বৈষম্য নয় ন্যায্যতা। বিএনপি আরও জানায়, ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ‘জনগণের দিন’ শুরু হবে।
নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষিত ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে—প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের পরিবারকে সহায়তার জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা বা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’ প্রবর্তন, সারাদেশে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগসহ দুর্নীতিমুক্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা।
এছাড়া বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন, প্রাথমিক শিক্ষায় ‘মিড-ডে মিল’ চালু, তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন এবং স্টার্টআপ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
ক্রীড়া খাতকে পেশা হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আধুনিক ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবেশ ও জলবায়ু সুরক্ষায় পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খাল খনন বা পুনঃখননের পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে।
ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালু এবং ডিজিটাল অর্থনীতি জোরদারে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে ‘পেপাল’ চালুসহ ই-কমার্স খাত সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
ইশতেহারের প্রধান ৫টি অধ্যায়—
প্রথম অধ্যায়: রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার ও সুশাসন
ইশতেহারের প্রথমভাগে রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারের অঙ্গীকার করেছে বিএনপি। এতে গুরুত্ব পেয়েছে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা।
এছাড়া, সাংবিধানিক সংস্কার, জাতিগঠন ও সুশাসনের লক্ষ্যে দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, জনপ্রশাসন, বিচার বিভাগ ও পুলিশ বাহিনীর সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার ওপরও বিশেষ জোর দিয়েছে দলটি।
দ্বিতীয় অধ্যায়: সামাজিক উন্নয়ন ও বৈষম্য নিরসন
বৈষম্যহীন আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে দ্বিতীয় অধ্যায় সাজানো হয়েছে। এতে দারিদ্র্য নিরসন, সামাজিক সুরক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে বিশেষ পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।
এছাড়া, দেশব্যাপী কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যুব উন্নয়ন, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং শ্রমিক কল্যাণের অঙ্গীকার করেছে বিএনপি। পরিবেশ সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানিসম্পদ পরিকল্পনা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
তৃতীয় অধ্যায়: ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠন ও ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য
তৃতীয় ভাগে স্থান পেয়েছে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় অর্থনীতি পুনর্গঠন। বিএনপি বলছে, ক্ষমতায় গেলে তারা অর্থনীতির 'গণতন্ত্রায়ণ' করবে এবং দেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দিকে নিয়ে যাবে। এই লক্ষ্যে বিনিয়োগ ও সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং পুঁজিবাজার সংস্কারের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
এছাড়া, জ্বালানি খাত, তথ্যপ্রযুক্তি, ব্লু ইকোনমি এবং সৃজনশীল অর্থনীতির উন্নয়নের মাধ্যমে টেকসই রাজস্ব ব্যবস্থাপনার রূপরেখা দেয়া হয়েছে।
চতুর্থ অধ্যায়: অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন ও পরিকল্পিত নগর
আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করতে চতুর্থ অধ্যায়ে বিশেষ পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— চট্টগ্রামকে দেশের 'বাণিজ্যিক রাজধানী' হিসেবে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠা করা।
এছাড়া, উত্তরাঞ্চল, হাওর-বাওড় ও উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য আলাদা উন্নয়ন পরিকল্পনা, পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং ঢাকাকে নিরাপদ ও টেকসই মেগাসিটি হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।
পঞ্চম অধ্যায়: ধর্ম, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যম
ইশতেহারের এই ভাগে ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষা এবং পাহাড় ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষার অঙ্গীকার করা হয়েছে। একইসাথে ক্রীড়া, শিল্প ও সংস্কৃতির বিকাশ এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সমাজের নৈতিকতার শক্তি পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠনের পাঁচ বছরের পরিকল্পনা তুলে ধরেছে দলটি।
বিএনপি বলছে, এটি কেবল নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি নয়, বরং একটি 'নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তি'। প্রতিশোধের রাজনীতিতে নয়, বরং ন্যায় ও মানবিকতায় বিশ্বাস করে বিএনপি। ক্ষমতার চেয়ে জনগণের অধিকারই তাদের রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করেছে দলটি।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন এবং নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খানের সঞ্চালনা করেন। এতে বিএনপির উর্ধ্বতন নেতার উপস্থিত ছিলেন।