বিশেষ প্রতিনিধি, Hafizur Rahman।।
মুদ্রাস্ফীতির চাপে থাকা সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির বার্তা নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করে তিনি করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর ছাড়, চিকিৎসা ব্যয় কমানো এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণসহ একাধিক জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের ঘোষণা দেন।
বাজেটে মধ্যবিত্তের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা হিসেবে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে বছরে সাড়ে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করমুক্ত থাকলেও আগামী অর্থবছরে তা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নারী করদাতা ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সী নাগরিকদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং তৃতীয় লিঙ্গ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ৫ লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে চাল, ডাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, ভোজ্যতেল, চিনি ও লবণসহ ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎস কর উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ২ থেকে ৫ শতাংশ হারে আদায় হওয়া উৎস কর কমিয়ে ০.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের আশা, এর ফলে বাজারে এসব পণ্যের দাম কমবে এবং ভোক্তারা সরাসরি উপকৃত হবেন।
স্বাস্থ্যসেবা খাতেও ব্যয় কমাতে বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিডনি রোগীদের ব্যবহৃত ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে সব ধরনের শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে প্রতিবার ডায়ালাইসিসে প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত খরচ কমতে পারে। পাশাপাশি হার্টের রিং এবং চোখের লেন্স আমদানিতে কর ছাড় দেওয়ায় এসব চিকিৎসা সামগ্রীর দামও কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রযুক্তি ও যোগাযোগ খাতে নতুন সিম কার্ডের ওপর আরোপিত ৩০০ টাকার কর পুরোপুরি প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবার ওপর উৎস কর ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ফলে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারের খরচ কিছুটা কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রবীণ নাগরিকদের জন্যও বিশেষ সুবিধার ঘোষণা এসেছে বাজেটে। ৬৫ বছরের বেশি বয়সী নাগরিকরা এখন থেকে সারা দেশে বিনামূল্যে ট্রেনে ভ্রমণ করতে পারবেন। এছাড়া মেট্রোরেলে ভ্রমণের ক্ষেত্রে তারা ২৫ শতাংশ ভাড়া ছাড় পাবেন।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় ৪১ লাখ নারীকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। এই কার্ডের মাধ্যমে উপকারভোগীরা মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে ভাতা পাবেন। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ভাতার পরিমাণ বাড়িয়ে মাসিক ১ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যার সুবিধা পাবেন প্রায় ৩৮ লাখ মানুষ।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামো বা পে-স্কেল কার্যকরের ঘোষণাও দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। মূল্যস্ফীতির প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, “আমাদের প্রধান লক্ষ্য বাজারে শান্তি ফিরিয়ে আনা এবং সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। গত কয়েক বছরের অর্থনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে আমরা একটি মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে চাই।
গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ প্রতিপাদ্যে প্রস্তাবিত বাজেটের আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে বাজেট ঘাটতি দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।
এই ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে সরকার। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে স্পিকারের সভাপতিত্বে এবং প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। এটি দেশের ৫৫তম জাতীয় বাজেট এবং বর্তমান সরকারের মেয়াদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট। আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন অর্থবছর কার্যকর হবে।
হাফিজ/ আয়না নিউজ