বিশেষ প্রতিনিধি, Md Al Rajib।।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদ অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন । নতুন এই দায়িত্ব প্রাপ্তির পর এখন বড় প্রশ্ন—তিনি কি মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করবেন, কিংবা আগামী এক বছর তিনি কী করবেন। একইসঙ্গে দুই পদে থাকার বিষয় জাতিসংঘের ৮০তম সাধারণ পরিষদের সভাপতির সঙ্গে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি আয়োজিত সংলাপে স্পষ্ট করেছেন ড. খলিলুর রহমান। পদত্যাগ করার প্রশ্নই আসে না। তিনি ছুটি নেবেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এতে ‘সায়’ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতীতেও একইসঙ্গে দুই পদে থাকার নজির আছে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যারা প্রার্থী ছিলেন, তারা রাষ্ট্রীয় কোনও দায়িত্ব ছিলেন না। সাবেক কূটনীতিক, সাবেক মন্ত্রী, সাবেক প্রেসিডেন্ট এমন পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সময়ের সীমাবদ্ধতা। মাত্র তিন মাস সময় হাতে পেয়ে বাংলাদেশকে এমন এক বৈশ্বিক কূটনৈতিক প্রচারণা পরিচালনা করতে হয়েছে, যা সাধারণত কয়েক বছরব্যাপী প্রস্তুতি ও ধারাবাহিক যোগাযোগের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে থাকে। বাংলাদেশ মূলত মাত্র তিন মাসের প্রচারণার মধ্যেই পাঁচ বছরের সমপরিমাণ কূটনৈতিক তৎপরতা সম্পন্ন করেছে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এর আগে ২০২০ সালে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ইউএনজিএ সভাপতি পদে নির্বাচনে প্রার্থিতা ঘোষণা করলেও ২০২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে দেশের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এরপর থেকেই পূর্ণমাত্রার কূটনৈতিক প্রচারণা শুরু হয়। দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির সুযোগ না থাকায় এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ এবং বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক ফোরামে অত্যন্ত সক্রিয় ও কৌশলগত প্রচারণা চালিয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন অর্জনে সফল হয়েছে।
অপরদিকে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাস ২০১৬ সালেই তাদের প্রার্থিতা ঘোষণা করে এবং গত এক দশক ধরে ধারাবাহিক প্রচারণা চালিয়েছে। বিশেষ করে গত একবছরে দেশটি অত্যন্ত বিস্তৃত ও সুসংগঠিত কূটনৈতিক প্রচারণা পরিচালনা করেছে।
জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের সমর্থন অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে এত অল্প সময়ে সমন্বিত কূটনৈতিক প্রচারণা পরিচালনা নিঃসন্দেহে খুবই কঠিন ও কৌশলগতভাবে চ্যালেঞ্জিং ছিল। এই প্রচারণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। পাশাপাশি নিউ ইয়র্কস্থ বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনসমূহ সমর্থন আদায়ে সমন্বিত ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে বলে জানান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা ।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) সভাপতি ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী জাতিসংঘের প্রধান আলোচনামূলক ও নীতিনির্ধারণী সংস্থার প্রধান প্রিসাইডিং অফিসার এবং চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করেন। নির্বাচিত সভাপতি মেয়াদে এক বছর। সভার নেতৃত্ব দেওয়া, বিতর্ক পরিচালনা এবং পরিষদের সামগ্রিক এজেন্ডা পরিচালনা করার জন্য সভাপতি দায়বদ্ধ। তার মূল দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে সভা পরিচালনা, এজেন্ডা পরিচালনা এবং কূটনৈতিক নেতৃত্ব।
গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ইস্যুতে আলোচনার গাইড করা, উচ্চ পর্যায়ের ইভেন্টগুলোতে ইউএনজিএ’র প্রতিনিধিত্ব করা এবং অ্যাসেম্বলির জরুরি বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করার কর্তৃত্ব রাখেন সভাপতি। এছাড়া তিনি সাধারণ পরিষদের প্রধান কমিটি এবং সহ-সভাপতিদের কাজ তদারকি করেন এবং জাতিসংঘের বার্ষিক অধিবেশনের মসৃণ অগ্রগতি নিশ্চিত করেন।
যেহেতু ইউএনজিএ সর্বজনীন প্রতিনিধিত্বের সঙ্গে একমাত্র জাতিসংঘ সংস্থা, সভাপতির ভূমিকা নির্বাহী বিভাগের চেয়ে প্রাথমিকভাবে পদ্ধতিগত এবং কূটনৈতিক সেহেতু তাদের অবশ্যই নিরপেক্ষ থাকতে হবে, পরিষদে সভাপতিত্ব করার সময় তাদের নিজ দেশের পক্ষে কোনও ভোট দেবে না এবং তারা চূড়ান্তভাবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে জবাবদিহি করবে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বর্তমান (৮০তম) অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবক। মঙ্গলবার (২ জুন) ভোটের মধ্য দিয়ে ৮১তম অধিবেশনের নতুন সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন ড. খলিলুর রহমান। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর এই অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে এবং ২২ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের ভাষণের মধ্য দিয়ে শুরু হবে উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক। ওই সভায় সভাপতিত্ব করবেন খলিলুর রহমান।
ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘের দায়িত্ব পালনকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কে থাকবেন তা নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রী করার বিষয়টিও আলোচনায় আছে। আগামী ৪ জুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফিরলে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
আল-রাজীব/আয়না নিউজ